আয়ভিত্তিক দেশ শ্রেণীকরণে ব্যবহৃত পদ্ধতি:
বিশ্বব্যংক ‘এটলাস মেথড’ নামের বিশেষ এক পদ্ধতিতে মাথাপিছূ জাতীয় আয় পরিমাপ কওে থাকে। একটি দেশের স্থানীয় মূদ্রায় মোট জাতীয় আয়কে (এঘও) মার্কিন ডলারে রূপান্তরিত করা হয়।এক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠানামা সমন্বয় করা সম্ভব হয়। এ কারনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) হিসাব আর বিশ্বব্যংকের হিসাব এক হয় না।
নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১,৩১৪ (বিবিএস এর সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী ১’৩১৬ মার্কিন ডলার)। তবে বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি অনুযায়ী তা এখন ১,০৪৫ ছাড়িয়ে গেছে। এ কারনেই নতুন তালিকায় মধ্যম আয়ের দেশ হতে পেরেছে বাংলাদেশ। স্বধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ নি¤œ আয়ের দেশের তালিকাভুক্ত ছিল। নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন।
বর্তমান বিশ্বে আয় শ্রেণিভিত্তিক দেশ:
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তালিকায় চারটি দেশ নি¤œ-মধ্যম আয়ের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে- বাংলাদেশ, কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্থান। সার্কভুক্ত ভারত ও পাকিস্থান নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত। সব মিলিয়ে এখন নি¤œ আয়ের দেশ ৩১টি, নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশ ৫৩টি এবং উচ্চ আয়ের দেশ ৮০টি।
নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতির সুবিধা-অসুবিধা:
মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকেই সূচক হিসেবে গণ্য কওে বিশ্বব্যাংক। অন্য কোনো ধরনের সূচক বিবেচনা করা হয় না। অথচ প্রবৃদ্ধি হলেই এর সুফল যে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলে পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই বরং এমনও দেখা যায় বৈষম্য বেড়েছে, অপূর্ণাঈ কর্মসংস্থান বেড়েছে, কৃষিখাতসহ শ্রমজীবী মানুষের আয়ের উৎসে ভাটা পড়েছে এবং সাধারন মানুষের জীবনমানে ঘটেছে অবনতি।
নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা ও অবস্থান আরও সুসংহত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজার থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি তুলনামুলক সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হবে। বাংলাদেশকে এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে গণ্য করা হবে। মধ্যম আয়ের তালিকায় ঢুকলেও বাংলাদেশ সহজ শর্তের (ওউঅ) ঋণ পেতে থাকবে। যেমনÑ এখন ৩৯ বছরে পরিশোধযোগ্য ঋণ পায় বাংলাদেশ, পরিশোধের জন্য বাড়তি আরও ৬ বছর সময় দেওয়া হয়। আর সুদ দিতে হয় ০.৭৫% হারে। তবে মাথাপিছু আয় একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে বেড়ে গেলে বাংলাদেশ আর পাবে না। তখন ৫%-এর বেশিহাওে সুদ দিতে হবে এবং পরিশোধের ক্ষেত্রেও স্বল্প সময় পাবে।
মধ্যম আয়ের ফাঁদ:
আয় বাড়লেই তাকে এখন আর উন্নয়ন বলা হয় না। ফলে কেবল আয় বাড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ে আছে বহু দেশ। এদের মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো আটকে আছে অনেক দিন ধরে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ- ব্রাজিল। এমনকি চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা আটকে আছে মধ্যম আয়ের ফাঁদে। মূলত যারা কেবল আয় বাড়াতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে কিন্তু অবকাঠামো, শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামুখী থাকার দিকে নজর দেয়নি, তারাই আটকে আছে এ মধ্যম আয়ের ফঁদে।
বিশ্বব্যাপী এখন নি¤œ আয়ের দেশের সংখ্যা কমছে। ১৯৯৪ সালে নি¤œ আয়ের দেশ ছিল ৬৪টি, এখন তা মাত্র ৩১টি, বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি আছে মধ্যম আয়ের দেশ। এ দেশগুলোর বেশিরভাগই ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় রয়ে গেছে।
এলডিসি বনাম মধ্যম আয়ের দেশ:
মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া একটি মর্যাদা। বিশ্বব্যাংক সাহায্য দেওয়ার সুবিধার জন্য এ শ্রেণীকরণটি করেছে। সুতরাং এর সঙ্গে জড়িত মূলত সাহায্য। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে। যেমন- স্বল্পোন্নত দেশ (খউঈ), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। এই সূচকের আওতায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ হতে বানিজ্যের ক্ষেত্রে বাজার সুবিধা পেয়ে থাকে। সুতরাং এর সঙ্গে জড়িত বাজার সুবিধা। বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এলডিসি থেকে উত্তরণ। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আয় বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা রোধকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।
উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ ও বাংলাদেশ:
বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২১ সাল নাগাদ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধরন করে। ‘রুপকল্প-২০২১’-এ মূলত বাংলাদেশকে ২০২১ সাল নাগাদ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়। যার সীমা ৪,০০০ ডলারের ওপরে।
তিনটি কারনে বাংলাদেশ দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় প্রবেশ করতে পেরেছে। প্রথমত, প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ হওয়ায় গড়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৪ শতাংশ হারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় আয় (এঘও)-কে সূচক হিসেবে নেওয়ায় প্রবাসী আয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তৃতীয়ত, ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্তিতিশীল থাকায় এর সুবিধাও বাংলাদেশ পেয়েছে।
মধ্যম আয়ের দেশের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়সীমা ১২,০০০ ডলারের ওপরে। আমাদের মাথাপিছু আয় ১৩১৬ ডলার। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, প্রকৃত মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশকে আরও ১১ হাজার ডলার মাতাপিছু আয় বাড়াতে হবে। বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে সেটা প্রয় অসম্ভব।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রশাসন ও সুশাসন:
বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির জন্য কার্যকর প্রশাসন ও সুশাসনের বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে অনুন্নয়নের কারন শুধু জনশক্তির অভাব কিংবা সম্পদেও অপ্রতুলতা নয়, বরং সুশাসনের অভাব এখানে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। এখানে বিভিন্ন বিষয় সূশাসনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে আছে। এখানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আছে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, সাংবিধানিক শাসন ও আইনের শাসনের অনুউপস্থিতি, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী গণমাধ্যমের অভাব, বৈদেশিক শক্তি ও দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সিন্ডিকেট, সামাজিক ঐক্যমত্যেও অভাব, এনজিও- এর নগণ্য ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ত্রুটি ও দুর্বল স্থানীয় সরকার।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থ ব্যতীত কোনো আধুনিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি, ১৯৪৭ সালের পরবর্তীতেও খুব একটা প্রশাসনিক সংস্কার দেখা যায়নি। সামরিক শাসকগণ নিজ উদ্দেশ্য সাধনে সময়ে সময়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে। দেশের আর্থিক প্রশাসনে গতি আনয়নের ক্ষেত্রে সর্বজনীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক।
বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রয়েছে ক্ষমতার ঔদ্ধত্য ও অপব্যবহার, কর্মের দীর্ঘসূত্রিতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, জনস্বার্থে গঠিত কমিটিসমূহের ব্যর্থতা ইত্যাদি। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো কখনো সম্ভব নয়।
প্রশাসকগণ উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে। জাতীয় ও স্থানীয় উভয় নির্বাচনে প্রশাসকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ সর্বোপরি কাঙ্খিত নিরাপত্তা বিধান করতে এ সকল অনুঘটকের ভূমিকা অপরিসীম।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত কওে স্বচ্ছতার ভিত্তি স্থাপন, সকল ¯তরে নাগরিক সেবা যথাসময়ে পৌছানোর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী মজবুত করে গড়ে তোলা, মতপার্থক্য রয়েছে এমন দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে স্বার্থের সংঘাতকে সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসার লক্ষ্যে প্রশাসনকে নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে।
কোনো সরকার যদি দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিতদের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের যথাযোগ্য বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয় তবে সবচেয়ে দক্ষ পদ্ধতিও টেকসই হবে না, কারণ তখন সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলো প্রকট হয়ে উঠবে। সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতাই সুশাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি। সরকার ও প্রশাসন একসাথে কাজ করলে এবং জনগণ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করলেই বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।