১
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ও বর্তমান বাংলাদেশঃ
সৃজনশীল শব্দের আবিধানিক অর্থ হল সৃষ্টিশীল। “যে শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে তাকে সৃজনশীল শিক্ষা বলে”।
কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে প্রচলিত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিটি কী এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে?
আমার বাবা একজন প্রাথমিক শিক্ষক ছিলেন (এখন অবসর প্রাপ্ত)। তাকে আমি ছত বেলা থেকেই একটি কথা বলতে দেখেছি। তিনি প্রায়ই বলেন “ একজন ভালো শিক্ষকের মহান দায়িত্ব হল নিজে পড়ে, বুঝে, শিখে তারপর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়ানো, বুঝানো এবং শেখানো উচিত।
তিনিও সেটাই করতেন। একজন শিক্ষকের আঞ্চলিক ভাষার টান থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যদি সেটা বুঝাতে পারেন তবেই তো শিক্ষার মুল সারমর্মটা অর্জিত হয়।
বর্তমান সময়ে যতগুলি শিক্ষক বাংলাদেশে কর্মরত আছন আমি তো মনে করি, এর মধ্যে ১০০%-ই বর্তমান প্রচলিত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিত নন। তবে কি তারা শিক্ষিত বা সুশিক্ষিত নন? অবশ্যই তারা সুশিক্ষিত।
গত কয়েকটা বছর খুব কাছ থেকে এই শিক্ষা পদ্ধতিটার সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি। তবে যেটুকু জানতে পেরেছি তা হল এই শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তব প্রয়োগ আছে মাত্র একটি যায়গায়। সেটি রাজনীতি।
(এ সম্পর্কে ২ নং পরিছেদে আলচনা করব)
তার আগে একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। গত ২৩-ফেব্রুয়ারি-২০১৬ সাল, আমি কয়েকজন নবম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীর সাথে আমি কথা বলেছিলাম সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে।
তাদেরকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে,
১. ম্যালেরিয়া কাকে বলে?
২. ম্যালেরিয়ার কারন ও লক্ষন বর্ণনা কর।
৩. ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক সম্পর্কে কী জনো?
তারা আমাকে বেশ সন্তোষজনক উত্তর দিয়াছিল।
প্রথম প্রশ্নের উত্তরে সবাই বলেছিল যে
১. আনেফিলিস মশকীর কামড়ের ফলে যে জ্বর দেখা দেয় তাকে ম্যালেরিয়া বলে।
২. ১নং প্রশ্নের উত্তরের মধেই ২নং এর কিছুটা উত্তর ছিল। লক্ষনের ক্ষেত্রে তারা বলেছিল যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, বমি হয়, জ্বর যখন ছেড়ে যায় তখন শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় ইত্যাদি।
৩. প্রতিরধের ক্ষেত্রে তারা বলেছিল যে মশকীর বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। এবং ডাক্তারি পরামর্শ নিতে হবে। কুইনাইন জাতীয় ঔষধ সেবন করতে হবে।
কিন্তু এই প্রশ্নগুলি যখন আমি সৃজনশীল (?) পদ্ধতি অনুযয়ী উদ্দিপক দিয়ে করলাম করলাম তখন ১৭ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র ১ জন নির্ধারিত সময়ে উত্তরদানে সক্ষম হয়ে ছিল।
আমার উদ্দীপকটি ছিল এরকম,
§ জনাব রহিম সাহেব এর ছেলের শরীর অসুস্থ। তার চোখ-মুখ লাল এবং জ্বর দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি সে বান্দরবান বেড়াতে গিয়েছিল। তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে এবং ছেড়ে যায়। সে দুর্বল হয়ে পড়ে। রহিম সাহেব ছেলেকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার ঔষধ দিলে রহিম সাহেব এর ছেলে সুস্থ হয়ে ওঠে।
ক) রহিম সাহেব এর ছেলের কী রোগ হয়েছে?
খ) রহিম সাহেব এর ছেলের রোগের কারন কী?
গ) এই ধরনের রোগ হলে তোমার করনীয় কী?
ঘ) ডাক্তারি পরামর্শে কেন রহিম সাহেব এর ছেলে ভালো হয়ে ওঠেন?
প্রশ্নটির ধরন বুঝে উঠতে উঠতে তাদের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ বাস্তব প্রয়োগে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির কোন প্রতিফলন ঘটে না।
আপনি ডাক্তারের কাছে গিয়ে কখনোই বলবেন না যে পাসের বাসার ওমুকের এই রকম হচ্ছিল, সেটা আমারও হচ্ছে। আপনি শুধুমাত্র আপনার সমস্যার কথা বলবেন। এবং সেটাই উচিত।
২.
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ও রাজনীতি শিক্ষাঃ
বর্তমান বাংলাদেশ এর রাজনীতি মানেই হল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলতে শেখা বা কথা বলা। আমাদের রাজনীতিবিদেরা কখনোই সরাসরি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে জানেন না নাকি পারেন না সেটাই বুঝি না।
v কিছুদিন আগে একটি ‘টক শো’ তে একজন প্রখ্যাত রাজনিতিবিদ কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে নির্বাচনী সহিংসতায় এত যে প্রান ঝরছে এর জন্য দায়ী কে?
তিনি উত্তর দিয়ে ছিলেন যে, পূর্বের নির্বাচন গুলির দিকে তাকান, দেখুন , দেখবেন তখন কি রকম সহিংসতা হয়েছে।
(বলি মশাই একটা সময় ছিল তখন এই বাংলাদেশও ছিল না। তবে কি আমরা দেশ পাই নি।কারন তখনকার রাজনীতি বিদেরা পিছনের দিকে তাকান নি। তারা সামনের দিকে তাকিয়েছিলেন বলেই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি।এ থেকে বোঝা যাই যে সামনের দিকে তাকান পিছনে নয়।)
আবার আর এক জন মহান(?) রাজনীতিবিদ এর কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে “সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এগুলি নিয়ন্ত্রণে আপনাদের পদক্ষেপ কি?”
ঐ মহান(?) রাজনীতিবিদ উত্তর দিয়ে ছিলেন যে, “দেখুন দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছে বিরোধীদল। তারা নানা রকম ষড়যন্ত্র করছে এই জনবান্ধব সরকার কে ক্ষমতাচ্যুত্য করার। কিন্তু আমি বলতে চাই তাদের এই ষড়যন্ত্র কখনোই সফল ভবে না”।
কী প্রশ্ন করা হল... আর তার কি ধরনের উত্তর পাওয়া গেল!
আমার তো এই সকল রাজনীতিবিদ এর মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ হয়। আরে ভাই, তুমি তো জানই যে বিরোধীদল ষড়যন্ত্র করছে। তাহলে প্রতিরোধ কেন করছ না। রোগের কারন যদি জানা থাকে, চিকিৎসা তো সহজ এবং সেভাবেই করা উচিত। তোমার তো উচিত সন্ত্রাস প্রতিরোধ এ কি কি করবে সেগুলা বলা। কারা ষড়যন্ত্র করছে সেটা তো তোমার কাছে জানতে চাওয়া হয় নি।
তোমার তো বলা উচিত ছিল যে,
I. এই ষড়যন্ত্র নিয়ে বা সন্ত্রাস প্রতিরধে আমাদের পুলিশ, র্যাব, কাজ করছে।
II. আমারা জনসচেনতা বাড়াতেও কাজ করছি।
III. প্রয়োজনে আমরা স্পেশাল টাস্কফোরস গঠন করব।
IV. পার্শ্ববর্তী দেশ গুলা থেকে যেন এরুপ জঙ্গি আমাদের দেশে না আস্তে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।
তা না বলে অমুক কি বলেছে তমুক কি করেছে সেটা নিয়ে পড়ে আছেন।
আসলে আমরা দুষিত দেশে থাকতে থাকতে অশ্লীল যুগের বাংলা ছিনেমার মত চলছি। এ থেকে বের হতে না পারলে কোন দিন এই দেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বা শহিদ জিয়ার প্রাণের বাংলা হতে পারবে না।
এবার উদাহরণ দেয়া জাক কিভাবে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে কথা ঘুরিয়ে বলা শেখানো হচ্ছে সেতার সম্পর্কে।
নিচের উদ্দিপকটি খেয়াল করিঃ
v আমরা শহরে থাকি। শিতের ছুটিতে গ্রামে দাদুর বাসায় বেড়াতে গেলাম। সেখানে সন্ধাবেলা দাদীমা সহ কয়েকজন একটি মাতির হাড়িতে চাল ভেজে গরম বালীতে ঢালছিল চাল ভাজার সময় তাতে লবন পানি দেয়া হচ্ছিল। একটি সুন্দর খাদ্য উৎপাদিত হয়েছিল। আমরা তা খেয়ে খুব মজা পেয়েছিলাম।
ক) মুড়ি কাকে বলে?
উত্তরঃ চাল ভাজা কে মুড়ি বলে।
(আমাদের মন্ত্রীরা হয়তো বলতেন, বিরোধী দলের চক্রান্তের ফলে বা বালী বোমার আঘাতে চাউল ফুটে যে সাদা বস্তু বের হয় তাকে মুড়ি বলে।)
খ) চাল ভাজাতে লবন পানি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ মুড়িকে সুস্বাদু ও সুন্দর রং করার জন্য লবন পানি দেয়া হয়।
(আমাদের নেতারা হয়তো বলতেন, পাদ্মা থেকে আনা লবন পানি দেয়ার ফলে পদ্মায় জল কমে যাচ্ছে। কিন্তু মুড়ির স্বাদ ভালো হচ্ছে। এতেই আমরা বুঝতে পারছি যে মুড়ি আমাদের পক্ষে আছে।)
গ) মুড়ি তৈরির পদ্ধতিটি বর্ণনা কর?
উত্তরঃ প্রথমে একটি মাটির হাড়িতে বালি গরম করতে হয়। তারপর মাটির হাড়িতে লবন পানি যুক্ত চাল ভেজে ঐ বালির হাড়িতে ঢালতে হয়। বালির হাড়িতে প্রচণ্ড ঝাকুনির সাহায্যে একটি অসংখ্যা ছিদ্র বিশিষ্ট হাড়িতে ঢালতে হয়। এবং ঝাঁটার কাঠি (আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলে ঝাঁটার শলা) দ্বারা নেড়ে পাত্রে ঢেলে নিতে হয়।
(আমাদের নেতারা হয়তো বলতেন, ডিজিটাল যুগের বাংলাদেশে ডিজিটাল ভাবে মুড়ি উৎপাদন করতে হবে। এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে যে মুড়িতে যেন ফটকিরি ও ইউরিয়া সার কম দেয়া হয়। আর পুরানো পদ্ধতিটাকে জাদুঘরে পাঠানো হবে। যেন ভবিসৎ প্রজন্ম এ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।)
ঘ) প্রাচীন পদ্ধতি ও মেশিনের দ্বারা মুড়ি ভাজার মধ্যে তুলনা কর?
উত্তরঃ
ক্রমিক
|
প্রাচীন পদ্ধতিতে মুড়ি ভাজা
|
ক্রমিক
|
মেশিনের দ্বারা মুড়ি ভাজা
|
১
|
প্রাচীন পদ্ধতিতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ভালো হয়।
|
১
|
মেশিনের দ্বারা ভাজা মুড়ির স্বাদ ভালো হয় না।
|
২
|
রং ভালো হয় না বা ধুসর বর্ণের হয়।
|
২
|
রং সাদা হয়।
|
৩
|
তৈরিতে খরচ কম, শ্রম বেশি লাগে।
|
৩
|
তৈরিতে খরচ বেশি, শ্রম কম লাগে।
|
৪
|
ভেজাল থাকে না।
|
৪
|
ভেজাল হিসেবে ফটকিরি ও ইউরিয়া সার থকতে পারে।
|
(আমাদের নেতারা হয়তো এ ভাবে উত্তর দিতেন,
১. আমরা মুড়ি খায়, বিরোধীদল মুড়ি খায় না।
২. আমরা মুড়িকে সবার দুয়ারে পৌঁছে দিব। কিন্তু বিরোধীদল মুড়িকে জাতীয় খাবার হিসেবে ঘোষণা করার যুক্তিহীন দাবিতে মেতেছে।
৩. আমরা ডিজিটাল মুড়ি উৎপন্ন করব। বিরধিদলের বালিবোমা আমাদের অগ্রযাত্রা কে রুখতে পারবে না।
এই হল সৃজনশীল শিক্ষা ব্যাবস্থা।
